০৫:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

“বিশ্বকাপ উন্মাদনায় দেশে প্রা’ণ গেলো ১২ জনের”

  • Khalid Hasan Ripu
  • আপডেট : ০৫:৫৮:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২২
  • ৬০ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিদিনের পোস্ট || বিশ্বকাপ উন্মাদনায় দেশে প্রা’ণ গেলো ১২ জনের|

বিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনার খেসারতে জীবন দিয়ে দিলেন ১২ জন। ফুটবল নিয়ে তর্ক-বিতর্কের জের ধরে সংঘর্ষে, পতাকা টানাতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে কিংবা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, খেলা দেখার সময় হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ১২ জন মারা গেছেন। এঁদের বেশির ভাগই কিশোর ও তরুণ।

এদিকে ফুটবল নিয়ে তর্ক-বিতর্কের জেরে বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষে এ পর্যন্ত আহত হয়েছেন অন্তত ২৭ জন। হতাহতদের সবাই বিশ্ব ফুটবলের প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থক।

বিশ্বকাপ শুরুর আগের সপ্তাহ থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গত এক মাসের সংবাদ ও তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময়ের মধ্যে দেশের তিন জেলায় খুন হয়েছেন তিনজন, সমর্থন করা দলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ও ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছেন ৭ জন এবং খেলা দেখার সময় উত্তেজিত হয়ে অসুস্থ হওয়ার পর দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া খেলাকে কেন্দ্র করে লালমনিরহাট, ভোলাসহ ছয়টি জেলায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও মারামারি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম চৌধুরী বলেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা কারণে মানুষের মধ্যে ধৈর্য, সহনশীলতা, সহমর্মিতা কমে যাওয়ায় এখন খেলার সমর্থনের মতো তুচ্ছ বিষয়ে মানুষ মারামারিতে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্র, সমাজ এবং পারিবারিক পর্যায় থেকে নাগরিকদের জন্য বিশেষ করে তরুণদের জন্য বিনোদনের বিকল্প উৎস তৈরি করতে না পারায় তাঁরা এখন খেলা দেখাসংক্রান্ত বিষয়েই বুঁদ হয়ে থাকেন। এসব কারণেই বাগ্‌বিতণ্ডা থেকে মারামারি, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটে।

তিন জেলায় তিন খুন

বিশ্বকাপে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে তর্কবিতর্কের জেরে দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে গত শুক্রবার রাতে ব্রাজিল বনাম ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের পর। এর একটি হয়েছে ঢাকার অদূরে সাভার উপজেলায়, অন্যটি হয়েছে হবিগঞ্জের বাহুবলে।

পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার রাতে সাভারের ডগরমোড়া এলাকার একটি চায়ের দোকানে ব্রাজিল-ক্রোয়েশিয়ার খেলা দেখেতে যান হাসান মিয়া (২৬) নামের এক তরুণ। খেলা শেষে রাত ১২টার দিকে ম্যাচের ফলাফল নিয়ে ওই দোকানে থাকা কয়েকজন তরুণের সঙ্গে তর্কে জড়ান হাসান। বাগ্‌বিতণ্ডার মধ্যেই ওই তরুণেরা হাসানকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যান। তাঁকে উদ্ধার করে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

একই রাতে হবিগঞ্জের বাহুবলের আদিত্যপুর এলাকায় খেলা শেষে আর্জেন্টিনা সমর্থক ও ব্রাজিল সমর্থক দুই কিশোরের মধ্যে ঝগড়া বাধে, যাতে জড়িয়ে পড়েন তাদের অভিভাবকেরা। এর জের ধরে পরদিন সকালে এক কিশোরের বাবাকে ধানখেতে বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে জখম করেন আরেক কিশোরের স্বজনেরা। শহীদ মিয়া নামের আহত ওই ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

এর আগে ৬ ডিসেম্বর ভোলার সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের চেউয়াখালী গ্রামে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের সমর্থকদের দুই পক্ষের সংঘর্ষে মো. হৃদয় (২০) নামের এক তরুণ নিহত হন। ৩ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনা-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের আগে নুডলস খাওয়ার আয়োজন নিয়ে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের দুটি পক্ষের সংঘর্ষ হয়। এর জের ধরে ৬ ডিসেম্বর রাতে আবার সংঘর্ষ বাধলে প্রতিপক্ষের হামলায় হৃদয় মারা যান।

সবচেয়ে বেশি মৃত্যু পতাকা টাঙাতে গিয়ে

বিশ্বকাপের মৌসুমে বাংলাদেশিরা তাঁদের প্রিয় দলের প্রতি সমর্থন জানাতে সবচেয়ে বেশি যে কাণ্ডটি করেন, তা হলো বাসাবাড়ি বা উঁচু গাছের মগডালে ওই সব দেশের পতাকা ওড়ানো। প্রতিবছরই পতাকা টাঙাতে গিয়ে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এবারও দেশের সাতটি জেলায় পতাকা টাঙাতে গিয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ছয়জন মারা গেছেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আর একজনের মৃত্যু হয়েছে ছাদ থেকে পড়ে।

মারা যাওয়া সাতজন হলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী, নওগাঁর ধামইরহাট, লক্ষ্মীপুরের রামগতি, টাঙ্গাইলের সখীপুর, খাগড়াছড়ি সদর, ময়মনসিংহের গফরগাঁও এবং কক্সবাজার সদর উপজেলার বাসিন্দা। তাঁরা সবাই বয়সে কিশোর ও তরুণ। এর মধ্যে চারজন ব্রাজিলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে ও তিনজন আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙাতে গিয়ে মারা গেছেন। এ ছাড়া পতাকা টাঙাতে গিয়ে ঢাকার কেরানীগঞ্জে দুই শিশুসহ হবিগঞ্জের বানিয়াচং ও ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে চারজন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দগ্ধ হয়েছেন।

খেলার উত্তেজনায় অসুস্থ হয়ে মৃত্যু

সংঘর্ষ, দুর্ঘটনার বাইরেও খেলার উত্তেজনা, উচ্ছ্বাসে অসুস্থ হয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ফরিদপুর ও নেত্রকোনা জেলার এই দুই ব্যক্তি আর্জেন্টিনার পাঁড় সমর্থক ছিলেন। তাঁদের একজন গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার সঙ্গে মেক্সিকো ম্যাচের পর এবং অন্যজন নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচের পর মারা যান। তাঁরা দুজনই খেলা দেখার সময় ‘হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে’ মারা গেছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

৫ জেলার সংঘর্ষে আহত ২৬

বিশ্বকাপের উত্তাপ চায়ের দোকানের তর্ক আর সামাজিক মাধ্যমের খুনসুটি পেরিয়ে সরাসরি সংঘাতও সৃষ্টি করেছে। এ সংঘাতের শুরু হয়েছিল গত ২৩ নভেম্বর। সেদিন বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হেরে যায় দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। এ নিয়ে খেলা শেষে ঢাকার সাভার উপজেলার বক্তারপুর এলাকার এবং গোপালগঞ্জ সদরের নবীনবাগ মার্কাস মহল্লায় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকেরা সংঘর্ষে জড়ান। এর মধ্যে সাভারে দুই কিশোরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখমের ঘটনাও ঘটে। গোপালগঞ্জে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হামলায় আহত হন ব্রাজিলের ৫ সমর্থক।

এরপর ৩ ডিসেম্বর লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তা রেলস্টেশন এলাকায় আর্জেন্টিনার পতাকা চুরি হওয়ার ঘটনায় ব্রাজিল সমর্থকদের সঙ্গে দলটির সমর্থকদের বাগ্‌বিতণ্ডার পর সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন, যার মধ্যে দুজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।

৬ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনা-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের আগে ভোলার সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের চেউয়াখালী গ্রামে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের দুপক্ষের মধ্যে যে সংঘর্ষ হয়, সেটিতেও আটজন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ওই সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু হয়েছিল।

বিশ্বকাপের এ উন্মাদনায় বাংলাদেশে সর্বশেষ মারামারির ঘটনা ঘটেছে ১০ ডিসেম্বর রাতে রাজশাহীর রাজপাড়া থানার নতুন বিলশিমলার বন্ধ গেট এলাকায়। কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের হারের পর আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা উল্লাস করলে নিষেধ করেন এক ব্রাজিল সমর্থক। এর জের ধরে আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ওই ব্রাজিল সমর্থকের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেন। এ সময় দুজনকে পিটিয়ে আহত করা হয়।

কেন এসব সংঘাত ও মৃত্যু—জানতে চাইলে সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নেহাল করিম বলেন, আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা না থাকায় যে যেমন অন্যায়ই করুক না কেন, পার পেয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশে সৃজনশীল কাজ, গঠনমূলক কাজ বা উৎপাদনমুখী কাজ করার বিষয়গুলো সেভাবে নেই। অফুরন্ত সময় হাতে থাকে বলেই মানুষ এ ধরনের কাজ করে। এই উন্মাদনা থেকে দূরে রাখতে তরুণদের উৎপাদনমুখী কাজে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।

এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ । রিপু /প্রতিদিনের পোস্ট

Facebook Comments Box
সম্পাদনাকারীর তথ্য

Khalid Hasan Ripu

জনপ্রিয়

শিক্ষিত লোকদের আমাকে ‘স্যার’ বলতে হবে, তাই ফলাফল এমন করা হয়েছে : হিরো আলম

error: Content is protected !!

“বিশ্বকাপ উন্মাদনায় দেশে প্রা’ণ গেলো ১২ জনের”

আপডেট : ০৫:৫৮:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২২

নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিদিনের পোস্ট || বিশ্বকাপ উন্মাদনায় দেশে প্রা’ণ গেলো ১২ জনের|

বিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনার খেসারতে জীবন দিয়ে দিলেন ১২ জন। ফুটবল নিয়ে তর্ক-বিতর্কের জের ধরে সংঘর্ষে, পতাকা টানাতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে কিংবা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, খেলা দেখার সময় হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ১২ জন মারা গেছেন। এঁদের বেশির ভাগই কিশোর ও তরুণ।

এদিকে ফুটবল নিয়ে তর্ক-বিতর্কের জেরে বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষে এ পর্যন্ত আহত হয়েছেন অন্তত ২৭ জন। হতাহতদের সবাই বিশ্ব ফুটবলের প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থক।

বিশ্বকাপ শুরুর আগের সপ্তাহ থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গত এক মাসের সংবাদ ও তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময়ের মধ্যে দেশের তিন জেলায় খুন হয়েছেন তিনজন, সমর্থন করা দলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ও ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছেন ৭ জন এবং খেলা দেখার সময় উত্তেজিত হয়ে অসুস্থ হওয়ার পর দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া খেলাকে কেন্দ্র করে লালমনিরহাট, ভোলাসহ ছয়টি জেলায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও মারামারি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম চৌধুরী বলেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা কারণে মানুষের মধ্যে ধৈর্য, সহনশীলতা, সহমর্মিতা কমে যাওয়ায় এখন খেলার সমর্থনের মতো তুচ্ছ বিষয়ে মানুষ মারামারিতে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্র, সমাজ এবং পারিবারিক পর্যায় থেকে নাগরিকদের জন্য বিশেষ করে তরুণদের জন্য বিনোদনের বিকল্প উৎস তৈরি করতে না পারায় তাঁরা এখন খেলা দেখাসংক্রান্ত বিষয়েই বুঁদ হয়ে থাকেন। এসব কারণেই বাগ্‌বিতণ্ডা থেকে মারামারি, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটে।

তিন জেলায় তিন খুন

বিশ্বকাপে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে তর্কবিতর্কের জেরে দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে গত শুক্রবার রাতে ব্রাজিল বনাম ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের পর। এর একটি হয়েছে ঢাকার অদূরে সাভার উপজেলায়, অন্যটি হয়েছে হবিগঞ্জের বাহুবলে।

পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার রাতে সাভারের ডগরমোড়া এলাকার একটি চায়ের দোকানে ব্রাজিল-ক্রোয়েশিয়ার খেলা দেখেতে যান হাসান মিয়া (২৬) নামের এক তরুণ। খেলা শেষে রাত ১২টার দিকে ম্যাচের ফলাফল নিয়ে ওই দোকানে থাকা কয়েকজন তরুণের সঙ্গে তর্কে জড়ান হাসান। বাগ্‌বিতণ্ডার মধ্যেই ওই তরুণেরা হাসানকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যান। তাঁকে উদ্ধার করে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

একই রাতে হবিগঞ্জের বাহুবলের আদিত্যপুর এলাকায় খেলা শেষে আর্জেন্টিনা সমর্থক ও ব্রাজিল সমর্থক দুই কিশোরের মধ্যে ঝগড়া বাধে, যাতে জড়িয়ে পড়েন তাদের অভিভাবকেরা। এর জের ধরে পরদিন সকালে এক কিশোরের বাবাকে ধানখেতে বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে জখম করেন আরেক কিশোরের স্বজনেরা। শহীদ মিয়া নামের আহত ওই ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

এর আগে ৬ ডিসেম্বর ভোলার সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের চেউয়াখালী গ্রামে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের সমর্থকদের দুই পক্ষের সংঘর্ষে মো. হৃদয় (২০) নামের এক তরুণ নিহত হন। ৩ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনা-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের আগে নুডলস খাওয়ার আয়োজন নিয়ে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের দুটি পক্ষের সংঘর্ষ হয়। এর জের ধরে ৬ ডিসেম্বর রাতে আবার সংঘর্ষ বাধলে প্রতিপক্ষের হামলায় হৃদয় মারা যান।

সবচেয়ে বেশি মৃত্যু পতাকা টাঙাতে গিয়ে

বিশ্বকাপের মৌসুমে বাংলাদেশিরা তাঁদের প্রিয় দলের প্রতি সমর্থন জানাতে সবচেয়ে বেশি যে কাণ্ডটি করেন, তা হলো বাসাবাড়ি বা উঁচু গাছের মগডালে ওই সব দেশের পতাকা ওড়ানো। প্রতিবছরই পতাকা টাঙাতে গিয়ে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এবারও দেশের সাতটি জেলায় পতাকা টাঙাতে গিয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ছয়জন মারা গেছেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আর একজনের মৃত্যু হয়েছে ছাদ থেকে পড়ে।

মারা যাওয়া সাতজন হলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী, নওগাঁর ধামইরহাট, লক্ষ্মীপুরের রামগতি, টাঙ্গাইলের সখীপুর, খাগড়াছড়ি সদর, ময়মনসিংহের গফরগাঁও এবং কক্সবাজার সদর উপজেলার বাসিন্দা। তাঁরা সবাই বয়সে কিশোর ও তরুণ। এর মধ্যে চারজন ব্রাজিলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে ও তিনজন আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙাতে গিয়ে মারা গেছেন। এ ছাড়া পতাকা টাঙাতে গিয়ে ঢাকার কেরানীগঞ্জে দুই শিশুসহ হবিগঞ্জের বানিয়াচং ও ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে চারজন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দগ্ধ হয়েছেন।

খেলার উত্তেজনায় অসুস্থ হয়ে মৃত্যু

সংঘর্ষ, দুর্ঘটনার বাইরেও খেলার উত্তেজনা, উচ্ছ্বাসে অসুস্থ হয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ফরিদপুর ও নেত্রকোনা জেলার এই দুই ব্যক্তি আর্জেন্টিনার পাঁড় সমর্থক ছিলেন। তাঁদের একজন গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার সঙ্গে মেক্সিকো ম্যাচের পর এবং অন্যজন নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচের পর মারা যান। তাঁরা দুজনই খেলা দেখার সময় ‘হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে’ মারা গেছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

৫ জেলার সংঘর্ষে আহত ২৬

বিশ্বকাপের উত্তাপ চায়ের দোকানের তর্ক আর সামাজিক মাধ্যমের খুনসুটি পেরিয়ে সরাসরি সংঘাতও সৃষ্টি করেছে। এ সংঘাতের শুরু হয়েছিল গত ২৩ নভেম্বর। সেদিন বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হেরে যায় দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। এ নিয়ে খেলা শেষে ঢাকার সাভার উপজেলার বক্তারপুর এলাকার এবং গোপালগঞ্জ সদরের নবীনবাগ মার্কাস মহল্লায় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকেরা সংঘর্ষে জড়ান। এর মধ্যে সাভারে দুই কিশোরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখমের ঘটনাও ঘটে। গোপালগঞ্জে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হামলায় আহত হন ব্রাজিলের ৫ সমর্থক।

এরপর ৩ ডিসেম্বর লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তা রেলস্টেশন এলাকায় আর্জেন্টিনার পতাকা চুরি হওয়ার ঘটনায় ব্রাজিল সমর্থকদের সঙ্গে দলটির সমর্থকদের বাগ্‌বিতণ্ডার পর সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন, যার মধ্যে দুজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।

৬ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনা-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের আগে ভোলার সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের চেউয়াখালী গ্রামে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের দুপক্ষের মধ্যে যে সংঘর্ষ হয়, সেটিতেও আটজন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ওই সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু হয়েছিল।

বিশ্বকাপের এ উন্মাদনায় বাংলাদেশে সর্বশেষ মারামারির ঘটনা ঘটেছে ১০ ডিসেম্বর রাতে রাজশাহীর রাজপাড়া থানার নতুন বিলশিমলার বন্ধ গেট এলাকায়। কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের হারের পর আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা উল্লাস করলে নিষেধ করেন এক ব্রাজিল সমর্থক। এর জের ধরে আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ওই ব্রাজিল সমর্থকের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেন। এ সময় দুজনকে পিটিয়ে আহত করা হয়।

কেন এসব সংঘাত ও মৃত্যু—জানতে চাইলে সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নেহাল করিম বলেন, আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা না থাকায় যে যেমন অন্যায়ই করুক না কেন, পার পেয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশে সৃজনশীল কাজ, গঠনমূলক কাজ বা উৎপাদনমুখী কাজ করার বিষয়গুলো সেভাবে নেই। অফুরন্ত সময় হাতে থাকে বলেই মানুষ এ ধরনের কাজ করে। এই উন্মাদনা থেকে দূরে রাখতে তরুণদের উৎপাদনমুখী কাজে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।

এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ । রিপু /প্রতিদিনের পোস্ট

Facebook Comments Box