কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার কামার পাড়ার কারিগর ও শ্রমিকেরা। কোরবানির কাজে ব্যবহৃত নতুন লোহার ছুরি, চাকু, চাপাতি, দা, বঁটি সহ নানা সরঞ্জাম তৈরির পাশাপাশি পশুর মাংস কাটার পুরনো সরঞ্জাম শাণ দেয়ার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। তবে কয়লা লোহা সহ অন্যান্য উপকরণের দাম বৃদ্ধির সাথে বিদেশ থেকে আমদানি হওয়া চাইনিজ ধারালো নানা সরঞ্জামাদি বাজারে সয়লাব করায় দিন দিন দেশি ধারালো অস্ত্রের চাহিদা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ফলে এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত কারিগর ও শ্রমিকেরা পরেছেন চরম বিপাকে। এছাড়াও কামার শিল্পীদের অনেকেই এখন বয়সের ভারে ন্যুজ। একদিকে বয়স বাড়ায় কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে পরিবারের কেউ এই পেশায় এগিয়ে আসছে না। কোনোরকম বয়স্ক ভাতাও পাচ্ছেন না। সব মিলিয়ে জীবন সায়াহ্নে এসে নিদারুন অর্থকষ্টে কাটাতে হচ্ছে প্রতিটি দিন। অনেকের আবার অন্য পেশা জানা না থাকায় বাধ্য হয়েই আঁকড়ে ধরে আছেন বাপ-দাদার কাছ থেকে শেখা এই পেশায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাতুড়ি আর লোহার টুংটাং শব্দে মুখরিত কামার পাড়ার চারপাশ। কেউ উত্তপ্ত লোহাকে পিটিয়ে মাংস কাটার নানা সরঞ্জামে রুপ দিচ্ছেন। আবার কেউ পুরনো ছুরি চাপাতি শাণ দিচ্ছেন। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এমন ব্যস্ততা বেড়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে কামার পাড়া গুলোতে। বছরের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে কোরবানি ঈদের আগে বেশি ব্যস্ত থাকেন কারিগররা। ছুরি, চাপাতি, দা, বঁটি ছাড়াও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করা বিভিন্ন লোহার পণ্য তৈরি করেন তারা।
কামার শিল্পের সাথে জড়িতরা প্রতিদিনের পোস্টকে জানান, লোহা, কয়লা ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় এসব সরঞ্জামাদি তৈরিতে বেড়েছে খরচ। বর্তমানে পশুর চামড়া ছাড়ানো ছুরি ১৫০ থেকে ৩০০, দা ২৫০ থেকে ৪০০, বঁটি ৩০০ থেকে ৫০০, পশু জবায়ের ছুরি ৪০০ থেকে ১০০০ টাকায়, চাপাতি ৫০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কামার শিল্পের সাথে জড়িত উপজেলার সোহাতা গ্রামের কেশব দেব প্রতিদিনের পোস্টকে জানান, বাপ-দাদার কাছ থেকে শিখা এই পেশায় প্রায় ২৫ বছর যাবত আছি, অন্য কোন কাজ জানা না থাকায় চাইলেও আর অন্য কিছু করতে পারছি না। তাছারা যেকোনো ব্যবসা করতে প্রচুর টাকার প্রয়োজন হয় সেই পরিমাণ টাকাও নেই। কোরবানি ঈদের সময় কাজের ব্যস্ততা থাকলেও বছরের প্রায় বেশিরভাগ সময় কাজ থাকে না। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে ধার-দেনা করে চলতে হয় ঈদ আসলে সেই ঋণ পরিশোধ করতে হয়। এ পেশায় পরিশ্রমের তুলনায় টাকা কম পাওয়া যায় এছাড়াও নানান প্রতিকূলতার ফলে নতুন করে এই পেশায় কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছে না। পেশাগত প্রয়োজনে ব্যাংক থেকেও ঋণ পাওয়া যায় না।
নবীনগর বাজারের পলাশ কর্মকার প্রতিদিনের পোস্টকে জানান, বাপ-দাদার পেশাটাকে ধরে রাখতে গিয়ে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়তি কিন্তু এই পেশায় পরিশ্রমের তুলনায় ইনকাম কম। সরকার যদি আমাদের দিকে এগিয়ে আসতো তাহলে আমরা এই পেশাটাকে ধরে রাখতে পারতাম তাছাড়া আমাদের পরে এই পেশায় আর কেউ আসতে চাইবে না।
এদিকে ক্রেতারা প্রতিদিনের পোস্টকে বলছেন, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দা, বঁটি, চাপাতি, ছুরি সহ পশুর মাংস কাটার বিভিন্ন সরঞ্জামাদির দাম বেশি নেয়া হচ্ছে। বুলবুল, জাকির, মুজাহিদ, তানজিল, সফর মিয়া সহ একাধিক ক্রেতা জানান, কোরবানির ঈদের সময় কসাই পাওয়া কিছুটা কঠিন হয়ে পরে। তাই নতুন দা, বঁটি, চাপাতি, ছুরি কেনা সহ মাংস কাটার পুরনো সরঞ্জাম শাণ দিয়ে নিচ্ছি।
নবীনগর বাজারের ব্যাবসায়ী ইসমাইল প্রতিদিনের পোস্টকে জানান, দির্ঘদিন ধরে এ পেশার সাথে জড়িত আছি, ভালো মানসম্মত পণ্য তৈরি করলেও বাজারে বিদেশ থেকে আসা চাইনিজ পণ্য গুলোর কারনে আমাদের দেশীয় পণ্যের সঠিক মূল্য পাচ্ছি না। চাইনিজ পণ্য গুলো টেকসই না হলেও দেখতে সুন্দর হওয়ায় ক্রেতারাও ওইসব পণ্য নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। এতে করে বাজার হারাচ্ছে দেশীয় তৈরি পণ্য।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজীব চৌধুরী প্রতিদিনের পোস্টকে বলেন, ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোকে সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ সরকার সবসময় সচেষ্ট। সরকারিভাবে প্রান্তিক পেশাজীবী দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে তাদেরকে আধুনিক প্রশিক্ষণ দিয়ে আরো দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে এবং প্রশিক্ষণ শেষে সরকার থেকে অনুদান দেওয়া হবে।