নিজস্ব প্রতিবেদক: ডিজিটাল লেনদেন সহজ করতে চালু হওয়া ‘বাংলা কিউআর’ এখন পণ্য বা সেবা কেনাকাটার পাশাপাশি নগদ টাকা উত্তোলনের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। কোনো পণ্য বা সেবা না কিনেই বিভিন্ন মার্চেন্টের কিউআর কোডে টাকা পাঠিয়ে বিনিময়ে নগদ অর্থ নেওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এতে একদিকে গ্রাহকের ক্যাশ আউটের খরচ কমছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট ব্যবসা হুমকির মুখে পড়ছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে চালু করা বাংলা কিউআরের এই ব্যবহার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ এমএফএস এজেন্টের কাছ থেকে নগদ টাকা তুলতে গ্রাহককে নির্ধারিত হারে ক্যাশ আউট চার্জ দিতে হয়। প্রতিষ্ঠানভেদে প্রতি হাজার টাকায় এ মাশুল প্রায় ১২ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী কোনো গ্রাহক সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা ক্যাশ আউট করলে তাঁকে ন্যূনতম প্রায় ৩৮৭ টাকা মাশুল দিতে হয়। অথচ অনেক ক্ষেত্রে মার্চেন্টের বাংলা কিউআর ব্যবহার করে একই পরিমাণ টাকা নগদে নেওয়া যাচ্ছে প্রায় বিনা খরচে।

প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ। কোনো পণ্য বা সেবা না কিনেও একজন গ্রাহক মার্চেন্টের কিউআর কোড স্ক্যান করে টাকা পাঠান। এরপর মার্চেন্ট ওই অর্থের সমপরিমাণ নগদ টাকা গ্রাহকের হাতে তুলে দেন। বিনিময়ে অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি না নিয়ে সামান্য কিছু অর্থ নেওয়া হচ্ছে। এতে গ্রাহকের ক্যাশ আউট খরচ কমছে এবং মার্চেন্টও বাড়তি আয় করছেন।

তবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এমএফএসের এজেন্টদের ওপর। দীর্ঘদিন ধরে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এজেন্টরা প্রত্যন্ত এলাকায় গ্রাহকদের নগদ টাকা জমা ও উত্তোলনের সেবা দিয়ে আসছেন। দেশে এমএফএসের এজেন্ট সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। কিউআরভিত্তিক নগদ উত্তোলন বাড়তে থাকলে এসব এজেন্টের ব্যবসা আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অপব্যবহারের সুযোগ বাড়ছে

এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ, বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনে নগদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে এমএফএসের মতো কঠোর সীমা ও নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে একজন গ্রাহক মার্চেন্টের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ নগদে তুলে নিতে পারছেন। এতে সন্দেহজনক লেনদেন, অর্থ পাচার ও হুন্ডির মতো অবৈধ কার্যক্রমের ঝুঁকিও বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে লেনদেনে বাংলা কিউআর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো মার্চেন্টদের কাছে বাংলা কিউআর স্থাপন করছে। একই মার্চেন্টের একটি ব্যাংক বা এমএফএস হিসাবের বিপরীতে একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে কিউআর কোড দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে।

এতে দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখন কিউআরভিত্তিক লেনদেনের আওতায় এসেছে। আর এই বিশাল মার্চেন্ট নেটওয়ার্কের একটি অংশ যখন নগদ উত্তোলনের বিকল্প মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন এমএফএসের প্রচলিত এজেন্ট কাঠামো চাপে পড়ছে।

অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য

কয়েকটি ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি বাংলা কিউআর ব্যবহার করে কিছু গ্রাহকের অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্ত করেছে। যাচাই করতে গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে।

উদাহরণ হিসেবে, নেত্রকোনার এক নারী গ্রাহকের নামে গত ১৪ থেকে ১৮ আগস্ট দুইটি ব্যাংকের কিউআর কোড ব্যবহার করে প্রায় ৩৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৯০ টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। এসব লেনদেন হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কয়েকটি মোবাইল ফোনের দোকানে।

অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক এমএফএস গ্রাহকের নামেও গত ১৬ ও ১৭ আগস্ট মাত্র দুই দিনে জেলার কয়েকটি দোকানের বাংলা কিউআর কোডে প্রায় ৪০ লাখ টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, এ ধরনের অনেক লেনদেনে ব্যবহৃত হিসাব বা মোবাইল নম্বর প্রকৃত ব্যবহারকারীর নামে নাও থাকতে পারে। প্রবাসী আয় কিংবা ব্যাংক থেকে আসা অর্থও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মার্চেন্টের মাধ্যমে নগদে তুলে নেওয়া হচ্ছে। ফলে এসব অর্থের প্রকৃত উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বাংলা কিউআরের মাধ্যমে নগদ অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি অবগত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। মার্চেন্টভিত্তিক লেনদেনে সীমা আরোপ করা যায় কি না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে।

অক্টোবর থেকে খরচ শূন্য

বাংলা কিউআর ব্যবহারে মার্চেন্টদের খরচ আরও কমানোর সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। আগামী অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণে মার্চেন্টদের খরচ শূন্য করার সিদ্ধান্ত রয়েছে।

ফলে একজন মার্চেন্ট কিউআর কোডের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করে সেই অর্থ নগদে ফেরত দিলেও আলাদা কোনো লেনদেন ব্যয় বহন করতে হবে না। বিপরীতে এমএফএস এজেন্টের কাছ থেকে নগদ টাকা তুলতে গ্রাহককে নির্ধারিত ক্যাশ আউট ফি দিতে হবে।

এমএফএস এজেন্টদের মাধ্যমে লেনদেনে যে ফি আদায় করা হয়, তার একটি অংশ এজেন্ট, পরিবেশক, মোবাইল অপারেটর এবং সরকার পেয়ে থাকে। কিন্তু মার্চেন্টের মাধ্যমে একই ধরনের নগদ উত্তোলন হলে সেই রাজস্ব কাঠামো কার্যত এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই ব্যবস্থায় গ্রাহক ও মার্চেন্ট উভয়েই লাভবান হচ্ছেন। গ্রাহক কম খরচে নগদ টাকা পাচ্ছেন এবং মার্চেন্ট কোনো পণ্য বিক্রি ছাড়াই অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করছেন। বিপরীতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের এজেন্ট নেটওয়ার্কের ব্যবসা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে।

রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা

সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ব্যবসা ও কোম্পানির লেনদেনের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দিয়েছে। বছরে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনে টার্নওভার কর না দেওয়ার সুবিধার কারণে মার্চেন্টদের মাধ্যমে কিউআর ব্যবহার করে নগদ অর্থ লেনদেনে করসংক্রান্ত চাপও তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর সাবেক মহাপরিচালক ও নগদের সাবেক চেয়ারম্যান কে এ এস মুরশিদ মনে করেন, বাংলাদেশের মতো নগদনির্ভর অর্থনীতিতে হঠাৎ করে পুরোপুরি ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালু করা বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর মতে, পরীক্ষামূলকভাবে বাংলা কিউআর চালু করে ধীরে ধীরে এর ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। যথাযথ প্রস্তুতি ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই বাধ্যতামূলক করায় মার্চেন্টরা পণ্য বিক্রির পরিবর্তে নগদ উত্তোলনের ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন।

তিনি আরও মনে করেন, এর ফলে সরকারের রাজস্ব কমতে পারে এবং অবৈধ অর্থ লেনদেনের সুযোগ বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা এবং নগদ লেনদেন কমানোর লক্ষ্যেই বাংলা কিউআর চালু করা হয়েছে। তবে এর কোনো ধরনের অপব্যবহার হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

প্রতিদিন লেনদেন ১৩৭ কোটি টাকা

বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক হওয়ার পর দেশজুড়ে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩৫ লাখ মার্চেন্টের কাছে বাংলা কিউআর স্থাপন করেছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩৭ কোটি টাকা কিউআর কোডের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে।

ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, কম খরচে নগদ টাকা পাওয়