ঢাকা , বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
নবীনগরে মেঘনা নদীর পাড় পরিষ্কারে ‘প্রত্যাশার আলো’র ব্যতিক্রমী উদ্যোগ জনবল সংকটে স্বাস্থ্য সেবাবঞ্চিত চায়ের রাজ্যের সাধারণ মানুষ মৌলভীবাজারে মাইক্রোবাস ও সিএনজি মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত-৩ শ্রীমঙ্গলে এক কিশোর নিখোঁজের দু’দিন পর লাশ উদ্ধার সিলেট জেলার খ্রিষ্টিয়ান সম্প্রদায়ের প্রেসবিটারিয়ার সিনডের বার্ষিক সভা কালীগঞ্জে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে ১ যুবকের ১ মাসের কা’রাদ’ণ্ড কালীগঞ্জে ড্রামে অতিরিক্ত তেল বিক্রি ফিলিং স্টেশনে ১০ হাজার টাকা জরিমান মৌলভীবাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে জরিমানা ভুল চিকিৎসায় ৭ম শ্রেনীর শিক্ষার্থীর মৃত্যু কালীগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযানে ২০ কেজি গাঁজাসহ আটক ১

ভারত থেকে কালো পানি উপহার পায় বাংলাদেশ

খন্দকার আলমগীর হোসেন
  • প্রকাশের সময় : ০৯:০৮:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
  • / ২৭৮ বার পড়া হয়েছে
৬৪

যুগের পর যুগ বাংলাদেশকে বর্জ্য পদার্থ যুক্ত কালো পানি উপহার দিচ্ছে ভারত। আর এই দূষিত পানির প্রভাব পড়ছে কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য উপর।

ভারতের ত্রিপুরার আগরতলা থেকে বাংলাদেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া সীমান্তের কালন্দি খাল ও মরানদী দিয়ে আসছে দুর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত এই কালো পানি। এতে করে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন সীমান্তের বাসিন্দারা। উৎকট গন্ধ কালো পানির কারণে নতুন আত্মীয়তা করতে পাচ্ছে না ওই এলাকার বাসিন্দারা। এছাড়া এই আবর্জনা যুক্ত কালো পানিতে ভারি ধাতুর উপস্থিতির পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারতের ত্রিপুরা আগরতলা শহরে ভূগর্ভস্থ কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। তাদের শহরের শিল্প কারখানার, হাসপাতাল, গৃহস্থালির বর্জ্য, নর্দমা ও শহরের স্যুয়ারেজ লাইনের দূষিত ময়লা যুক্ত কালো পানি বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে  ওই তিনটি খাল দিয়ে ঢুকছে। পানিগুলোর সাথে সিসা, সালফার, দস্তা, ক্রোমিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ক্যাডমিয়াম ও আয়রনের মতো ভারি রাসায়নিক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে

বলে জানা যায়। যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই দূষিত পানি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ঐতিহ্যবাহী তিতাস নদীতে মিশে যাচ্ছে। এতে করে নদীটির দূষিত হয়ে অস্তিত্ব হারাচ্ছে। এছাড়াও সীমান্তবর্তী আখাউড়া উপজেলার দুইটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার অন্তত ২০-২৫টি গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি সমস্যায় পড়তেছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কালন্দি খালে ও বাউতলার মরানদী দিয়ে ভেসে আসছে দূষিত বর্জ্য। সীমান্তবর্তী কালিকাপুর গ্রামের জাজিনদী দিয়েও আসছে এ দূষিত পানি, যা মোগড়া ইউনিয়নের সেনারবাদী এবং আখাউড়া পৌর এলাকা হয়ে তিতাস নদীতে গিয়ে মিলিত হচ্ছে। আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট হয়ে যাতায়াতকারী যাত্রী, পর্যটক, বন্দর ও কাস্টমসে কর্মরতদের পানির উৎকট দুর্গন্ধ কারণে তাদের অনেক সমস্যা পোড়াতে হচ্ছে। ওই অঞ্চলের মানুষরা  চর্ম ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাছাড়া খাল ও নদীতে থেকে দেশীয় মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। বেড়েছে মশা, মাছি এবং অন্যান্য বিষাক্ত পোকামাকড়ের প্রজনন।

স্থানীয়রা জানান, এক সময় মিঠা পানির অন্যতম উৎস ছিল এই খালের পানি। অথচ এখন আমরা এই খালকে ‘কালন্দী’ (কালো পানির খাল) নামে ডাকি। যুগ যুগ ধরে আমরা ভুক্তভোগীরা পানি পরিশোধনের দাবি জানিয়ে আসছি। যদিও দূষিত পানি পরিদর্শন ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং পর্যবেক্ষণ করেছে যৌথ নদী কমিশন। তারা পানি পরীক্ষা ও নমুনা সংগ্রহ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকছেন। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। হুমকির মুখে পড়েছে আমাদের খাল-বিল, নদীসহ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হিমেল খান বলেন, দূষিত পানির প্রভাবে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট ও এলার্জি রোগ হতে পারে। এ পানির মাছ খাওয়াও মানবদেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এই বিষাক্ত ও দূষিত পানি বন্ধে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন আখাউড়াবাসী।

এদিকে বিষাক্ত এ পানি বাংলাদেশে প্রবেশের আগে পরিশোধন করতে ইফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) স্থাপনের আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কিছুই করেনি ত্রিপুরা রাজ্য সরকার। ২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি আখাউড়া স্থলবন্দরের নো-ম্যান্স ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পানীয় জল ও স্বাস্থ্যবিধি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী রাম কৃপাল যাদব ইটিপি স্থাপনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। প্রায় ১০ বছর পার হয়েছে, কিন্তু সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন হয়নি।

আখাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছাম্মদ তানিয়া তাবাসসুম বলেন, এই পানি মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, ঢাকা থেকে পরীক্ষা করে পানির সঙ্গে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া গেছে। পানির মান ভালো না হলেও একমাত্র প্রয়োজনের তাগিদে স্থানীয় কৃষকরা ব্যবহার করে থাকেন। কৃষি বিভাগের লোকজন প্রায়ই মাঠ দিবসের মিটিংয়ে এ পানি ব্যবহার না করতে কৃষকদের অনুরোধ করেন। এছাড়া এ দূষিত কালো পানি কৃষি ফসলে ব্যবহার করলে এর প্রভাব মানবদেহেও পড়ে।

তরী বাংলাদেশের আহ্বায়ক মো.শামীম আহমেদ বলেন, ‘নিজেদের স্বার্থে হলেও বাংলাদেশের উচিত নিজেদের সীমান্তের ভেতরে পরিশোধনের ব্যবস্থা করে পানিটাকে বিশুদ্ধ করে আমাদের খালে ছাড়া হয়। তাহলে কিন্তু আমাদের তিতাস নদী এবং আশেপাশের মানুষ বেঁচে যাবে।’

এদিকে বিষয়টি নিয়ে জোরালো আলোচনা চলছে বলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দিদারুল আলম জানান, খালে পানি ছাড়ার আগে ন্যূনতম পরিশোধন নিশ্চিত করার বিষয়ে ব্যবস্থার নেয়ার চেষ্টা চলছে। এটা ইন্টারন্যাশনাল ফাংশন। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। খুব দ্রুত যাতে এটা সমাধান করা যায় আমরা সে চেষ্টা চালাচ্ছি।’

ট্যাগস :

এই নিউজটি শেয়ার করুন

ভারত থেকে কালো পানি উপহার পায় বাংলাদেশ

প্রকাশের সময় : ০৯:০৮:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
৬৪

যুগের পর যুগ বাংলাদেশকে বর্জ্য পদার্থ যুক্ত কালো পানি উপহার দিচ্ছে ভারত। আর এই দূষিত পানির প্রভাব পড়ছে কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য উপর।

ভারতের ত্রিপুরার আগরতলা থেকে বাংলাদেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া সীমান্তের কালন্দি খাল ও মরানদী দিয়ে আসছে দুর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত এই কালো পানি। এতে করে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন সীমান্তের বাসিন্দারা। উৎকট গন্ধ কালো পানির কারণে নতুন আত্মীয়তা করতে পাচ্ছে না ওই এলাকার বাসিন্দারা। এছাড়া এই আবর্জনা যুক্ত কালো পানিতে ভারি ধাতুর উপস্থিতির পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারতের ত্রিপুরা আগরতলা শহরে ভূগর্ভস্থ কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। তাদের শহরের শিল্প কারখানার, হাসপাতাল, গৃহস্থালির বর্জ্য, নর্দমা ও শহরের স্যুয়ারেজ লাইনের দূষিত ময়লা যুক্ত কালো পানি বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে  ওই তিনটি খাল দিয়ে ঢুকছে। পানিগুলোর সাথে সিসা, সালফার, দস্তা, ক্রোমিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ক্যাডমিয়াম ও আয়রনের মতো ভারি রাসায়নিক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে

বলে জানা যায়। যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই দূষিত পানি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ঐতিহ্যবাহী তিতাস নদীতে মিশে যাচ্ছে। এতে করে নদীটির দূষিত হয়ে অস্তিত্ব হারাচ্ছে। এছাড়াও সীমান্তবর্তী আখাউড়া উপজেলার দুইটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার অন্তত ২০-২৫টি গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি সমস্যায় পড়তেছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কালন্দি খালে ও বাউতলার মরানদী দিয়ে ভেসে আসছে দূষিত বর্জ্য। সীমান্তবর্তী কালিকাপুর গ্রামের জাজিনদী দিয়েও আসছে এ দূষিত পানি, যা মোগড়া ইউনিয়নের সেনারবাদী এবং আখাউড়া পৌর এলাকা হয়ে তিতাস নদীতে গিয়ে মিলিত হচ্ছে। আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট হয়ে যাতায়াতকারী যাত্রী, পর্যটক, বন্দর ও কাস্টমসে কর্মরতদের পানির উৎকট দুর্গন্ধ কারণে তাদের অনেক সমস্যা পোড়াতে হচ্ছে। ওই অঞ্চলের মানুষরা  চর্ম ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাছাড়া খাল ও নদীতে থেকে দেশীয় মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। বেড়েছে মশা, মাছি এবং অন্যান্য বিষাক্ত পোকামাকড়ের প্রজনন।

স্থানীয়রা জানান, এক সময় মিঠা পানির অন্যতম উৎস ছিল এই খালের পানি। অথচ এখন আমরা এই খালকে ‘কালন্দী’ (কালো পানির খাল) নামে ডাকি। যুগ যুগ ধরে আমরা ভুক্তভোগীরা পানি পরিশোধনের দাবি জানিয়ে আসছি। যদিও দূষিত পানি পরিদর্শন ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং পর্যবেক্ষণ করেছে যৌথ নদী কমিশন। তারা পানি পরীক্ষা ও নমুনা সংগ্রহ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকছেন। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। হুমকির মুখে পড়েছে আমাদের খাল-বিল, নদীসহ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হিমেল খান বলেন, দূষিত পানির প্রভাবে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট ও এলার্জি রোগ হতে পারে। এ পানির মাছ খাওয়াও মানবদেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এই বিষাক্ত ও দূষিত পানি বন্ধে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন আখাউড়াবাসী।

এদিকে বিষাক্ত এ পানি বাংলাদেশে প্রবেশের আগে পরিশোধন করতে ইফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) স্থাপনের আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কিছুই করেনি ত্রিপুরা রাজ্য সরকার। ২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি আখাউড়া স্থলবন্দরের নো-ম্যান্স ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পানীয় জল ও স্বাস্থ্যবিধি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী রাম কৃপাল যাদব ইটিপি স্থাপনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। প্রায় ১০ বছর পার হয়েছে, কিন্তু সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন হয়নি।

আখাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছাম্মদ তানিয়া তাবাসসুম বলেন, এই পানি মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, ঢাকা থেকে পরীক্ষা করে পানির সঙ্গে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া গেছে। পানির মান ভালো না হলেও একমাত্র প্রয়োজনের তাগিদে স্থানীয় কৃষকরা ব্যবহার করে থাকেন। কৃষি বিভাগের লোকজন প্রায়ই মাঠ দিবসের মিটিংয়ে এ পানি ব্যবহার না করতে কৃষকদের অনুরোধ করেন। এছাড়া এ দূষিত কালো পানি কৃষি ফসলে ব্যবহার করলে এর প্রভাব মানবদেহেও পড়ে।

তরী বাংলাদেশের আহ্বায়ক মো.শামীম আহমেদ বলেন, ‘নিজেদের স্বার্থে হলেও বাংলাদেশের উচিত নিজেদের সীমান্তের ভেতরে পরিশোধনের ব্যবস্থা করে পানিটাকে বিশুদ্ধ করে আমাদের খালে ছাড়া হয়। তাহলে কিন্তু আমাদের তিতাস নদী এবং আশেপাশের মানুষ বেঁচে যাবে।’

এদিকে বিষয়টি নিয়ে জোরালো আলোচনা চলছে বলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দিদারুল আলম জানান, খালে পানি ছাড়ার আগে ন্যূনতম পরিশোধন নিশ্চিত করার বিষয়ে ব্যবস্থার নেয়ার চেষ্টা চলছে। এটা ইন্টারন্যাশনাল ফাংশন। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। খুব দ্রুত যাতে এটা সমাধান করা যায় আমরা সে চেষ্টা চালাচ্ছি।’