“ময়লার ভাগাড় ঢাকার খাল”
- প্রকাশের সময় : ০২:৪৬:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ নভেম্বর ২০২২
- / ২৫৮ বার পড়া হয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিদিনের পোস্ট || ময়লার ভাগাড় ঢাকার খাল|
ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে ঢাকার খালগুলো। রাজধানীর খাল রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করা হলেও এর সুফল পাচ্ছেন না নগরবাসী। সংস্কারের পর রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং বর্জ্যরে অব্যবস্থাপনার কারণে ফের ভরাট হয়ে পড়ে খাল। আর অনেক জায়গায় সেই সুযোগ কাজে লাগায় অবৈধ দখলদাররা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার খাল ভরাট ও বেদখলের ফলে জলাবদ্ধতা এবং পরিবেশ দূষণ বাড়ছে। তা ছাড়া যানজট নিরসনে নৌ-রুট প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনাও ভেস্তে যাচ্ছে। ওয়াসার কাছ থেকে বুঝে নেওয়ার পর সিটি করপোরেশন নিজস্ব ফান্ড থেকে অনেক খাল পরিষ্কার করে। কিন্তু সেসব খাল আবারও ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার খালগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ ও সৌন্দর্য্যবর্ধনের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করছে সরকার। এরই মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) চারটি খাল সংস্কার এবং নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে ৮৯৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) এলাকার খালের জন্য ৬৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন অপেক্ষায় আছে। ডিএসসিসি বাকি খালগুলো নিয়েও আলাদা প্রকল্প তৈরি করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর ৪৬টি খালের মধ্যে ২০টিই বিলীন হয়ে গেছে। কাগজে-কলমে ২৬ খালের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও দখল ও দূষণে এগুলোও হারিয়ে যেতে বসেছে। খালগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করতে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর নন্দীপাড়া (জিরানি), রামপুরা, মান্ডা, কাটাসুর, লাউতলা ও ইব্রাহিমপুর খালের বেহাল অবস্থা। এসব খালে আশপাশের বাসাবাড়ির সব পয়ঃবর্জ্য গিয়ে পড়ছে।
খিলগাঁও রেলক্রসিং থেকে তালতলা মার্কেটের দিকে যাওয়ার পথে যে কারও চোখে পড়বে খিলগাঁও-বাসাবো খালের সীমানা পিলার। ঢাকা ওয়াসা এ পিলার স্থাপন করলেও সেখানে খালের কোনো অস্তিত্ব নেই। খাল ভরাট করে মাটির নিচে পাইপ ড্রেন তৈরি করে রেখেছে দখলদাররা। বাসাবো এলাকায় এ খালের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও খিলগাঁও অংশে তা বিলীন হয়ে গেছে।
মান্ডা খালের গুদারাঘাট এলাকার ব্রিজের দুই পাশে যতদূর দেখা যায়, ততদূর চোখে পড়ে ময়লার স্তূপ। কিছু অংশ দখল করে গোয়ালঘর, দোকান ও আবাসিক ভবনসহ নানা স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে।
নন্দীপাড়া খালও ময়লার স্তূপে মৃতপ্রায়। মাদারটেক অংশে খালের মধ্যে খুঁটি পুঁতে বিপুলসংখ্যক দোকান বসানো হয়েছে। এসব বাঁশের খুটিতেও ময়লা আটকে স্তূপ হয়ে আছে। আর বাগানবাড়ী মাদারটেক এলাকায় ওয়াসা পানির পাম্পের পাশে খালের অবস্থা খুবই করুণ। ওখানে খালে ময়লার স্তূপ দেখা গেছে।
রামপুরা খালে অবৈধ দখল তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও দূষণের ফলে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। খালটির মেরাদিয়া বাজার অংশে বিশাল ময়লার ভাগাড় রয়েছে। ওখানে ময়লা ফেলার সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) থাকলেও সেটি অনেকদিন ধরে নষ্ট। এ এসটিএসের সামনে খালের পাড়ে বনশ্রী ও দক্ষিণ বনশ্রীর বাসাবাড়ির ময়লা ফেলা হয়। কিছু ময়লা ল্যান্ডফিল্ডে নিলেও অধিকাংশ খালে পড়ে। এ ছাড়া খালের ডি ব্লক অংশে মূল সড়কের পাশে খাল পাড়ে ময়লা ফেলা হয়। এসব ময়লার সবটুকুই খালে গিয়ে পড়ে। এতে খালের নিচের অংশ অনেকটা ভরাট হয়ে গেছে। একই অবস্থা কাটাসুর খাল, রূপনগর খাল, সাংবাদিক কলোনি খাল ও কল্যাণপুর খালের। বিভিন্ন সময় অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং খাল পরিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও তা আবার পুরোনো রূপে ফিরছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান সময়ের আলোকে বলেন, ‘খালগুলো বুঝে পাওয়ার পর ঢাকা দুই সিটি করপোরেশন তোড়জোর করে কিছু বর্জ্য অপসারণ করেছিল। এখন আবার পুরোনো রূপে ফিরে গেছে খালগুলো। এর অন্যতম কারণ কমিউনিটিকে এনগেজ করতে পারেনি। যদি এলাকার মানুষকে সচেতন করা হতো, তাহলে এই অবস্থা হতো না। এখন শুধু মাঝেমধ্যে এদিক-ওদিক রুটিন মাফিক অভিযান চালিয়ে ক্ষ্যান্ত তারা।’
তিনি আরও বলেন, ‘খালগুলো হাতে পাওয়ার পর সর্বপ্রথম খালের দখলদারদের তালিকা করা উচিত ছিল। ওই তালিকা অনুযায়ী উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করত, তাহলে খালের এই অবস্থা হতো না।’
ডিএসসিসির কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের চারটি খালের প্রায় ২০ কিলোমিটার দখলমুক্ত ও সংস্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব খাল দখলমুক্ত করে দুই পাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করে নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে।
‘খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি’ শীর্ষক প্রকল্পটি এরই মধ্যে একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। এ প্রকল্পে ব্যয় হবে ৮৯৮ কোটি টাকা। যা ২০২৬ সালের জুন মাসের মধ্যে শেষ করার কথা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক খাইরুল বাকের সময়ের আলোকে বলেন, ‘প্রকল্প পাশ হওয়ার আগে থেকেই আমরা নিজস্ব অর্থায়নে খাল পুনরুদ্ধার কাজ করছি। কিন্তু সেগুলো অনেক জায়গায় টেকসই হচ্ছে না। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে খাল উদ্ধার করে নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে। রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। যার ফলে কেউ চাইলেই আর খাল দখল বা দূষণ করতে পারবে না।’
সংস্থাটির মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘ডিএসসিসির আওতাধীন খালগুলোর সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে চারটি খালের একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। তা ছাড়া চলতি বছর বাজেটে খাল সংস্কার কাজে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। খালগুলো পরিষ্কার করে নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করতে কাজ করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘খালের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রাথমিকভাবে পরিষ্কার কার্যক্রম শুরু করি। গত দুই বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন বর্জ্য অপসারণ করি। কিন্তু মানুষের সচেতনতার অভাবে আবার ময়লা জমতে শুরু করে।’
ডিএনসিসির কর্মকর্তারা জানান, খাল সংস্কার নিয়ে তারা মাস্টারপ্ল্যান করছেন। এ জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ঠিক করা হয়েছে। তারা খালকে দৃষ্টিনন্দন কীভাবে করা যায়Ñসে আলোকে লে-আউট ডিজাইন তৈরি করছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনী দ্বারা খালের সীমানা নির্ধারণ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সিএস, আরএস জরিপের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি খালের সীমানা ঠিক করা হয়েছে। বাকিগুলোর কাজও শিগগিরই শেষ হবে। এরপরই উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হবে। তা ছাড়া ডিএনসিসির খাল সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টিতে ৬৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এটা অনুমোদন পেলে বাইশটেকি, সাংবাদিক কলোনি খাল এবং কুর্মিটোলা খালের সংস্কার কাজ করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসি মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডিএনসিসির আওতাধীন খালগুলোতে ৪২টি ‘ডেড স্পট’ চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ সেখানে আগে খাল ছিল, এখন আর নেই। পানি প্রবাহ চলমান রাখতে হলে খালগুলো উদ্ধার করতে হবে। সেনাবাহিনী খালগুলোর সীমানা চিহ্নিতকরণ ও নির্ধারণের কাজ করছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা কাজ করতে গিয়ে দেখেছি মানুষ খালকে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করছে। খালে পলিথিন, পুরোনো সোফা, কার্পেট, চটের বস্তাসহ বাসাবাড়ির সব ধরনের ময়লা ফেলা হয়েছে। খালে ময়লা ফেলা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। খাল দিয়ে নৌযান চলবে, মাছের চাষ হবে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে। এর জন্য সরকার ও সিটি করপোরেশনের সঙ্গে জনগণেরও দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ । রিপু /প্রতিদিনের পোস্ট























