ঢাকা , রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অবৈধ বালু উত্তোলনে আশুগঞ্জে আতঙ্ক

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
  • প্রকাশের সময় : ১২:৪৪:০৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
  • / ১১ বার পড়া হয়েছে

নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মেঘনা নদীতে ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন এবং পূর্বাঞ্চলের ২৮টি জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী জাতীয় গ্রিডলাইনের গুরুত্বপূর্ণ টাওয়ার (পিলার) নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।

এদিকে, মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরসোনারপুর গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষও চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, অব্যাহত নদীভাঙনে পুরো চর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চললেও তা বন্ধে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।

সরেজমিনে যা দেখা গেছে

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মেঘনা নদীর বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে দিন-রাত শক্তিশালী একাধিক ড্রেজারের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে বালু উত্তোলন চলছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং নদীভাঙন দ্রুত আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন ও জাতীয় গ্রিডলাইনের পিলারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

নদী সুরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে পিলারের গোড়া থেকে বালু সরে গেলে যে কোনো সময় তা ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় গ্রিডের আওতাধীন ২৮টি জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিলীন হওয়ার শঙ্কায় চরসোনারপুর

অবৈধ ড্রেজিংয়ের ফলে চরসোনারপুর গ্রামের বসতবাড়ি ও আবাদি জমির খুব কাছ পর্যন্ত নদীভাঙন পৌঁছে গেছে। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা ভোজন চন্দ্র দাস বলেন, “প্রভাবশালীরা দিন-রাত ড্রেজার দিয়ে বালু তুলছে। প্রতিবাদ করলে হুমকি দেওয়া হয়। এভাবে চলতে থাকলে পুরো চর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে।”

আরেক বাসিন্দা রানা সরকার বলেন, “অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে আমাদের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। নদীভাঙনে চর আগেই অনেক ছোট হয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। আমরা দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ চাই।”

জাতীয় সম্পদ রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপের দাবি

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, অবিলম্বে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে নদীর পরিবেশ এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় শুধু চরসোনারপুর নয়, দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

নদী সুরক্ষা বিষয়ক সংগঠন ‘তরী বাংলাদেশ’-এর আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, “অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমরা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উত্থাপন করেছি। সেখানে জানানো হয়েছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশে কোনো ধরনের বালু উত্তোলনের লিজ দেওয়া হয়নি। কিশোরগঞ্জের ভৈরব অংশে লিজ থাকলেও একটি চক্র রাতের আঁধারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমানায় প্রবেশ করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। এতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো হুমকির মুখে পড়ছে। দ্রুত এই কার্যক্রম বন্ধ করা প্রয়োজন।”

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততা থাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা আইনগত অভিযান না থাকায় বালু উত্তোলনকারী সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, “কিশোরগঞ্জ অংশে ইজারা দেওয়া হলেও সেটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ অংশ থেকে প্রায় তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরে। কিন্তু একটি চক্র রাতের আঁধারে আমাদের সীমানায় প্রবেশ করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে।”

তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী দুই জেলার সমন্বয়ে খুব শিগগিরই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ট্যাগস :
প্রফেশনাল নিউজ পোর্টাল দিচ্ছে থিম বিক্রয় ডটকম

এই নিউজটি শেয়ার করুন

অবৈধ বালু উত্তোলনে আশুগঞ্জে আতঙ্ক

প্রকাশের সময় : ১২:৪৪:০৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মেঘনা নদীতে ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন এবং পূর্বাঞ্চলের ২৮টি জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী জাতীয় গ্রিডলাইনের গুরুত্বপূর্ণ টাওয়ার (পিলার) নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।

এদিকে, মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরসোনারপুর গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষও চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, অব্যাহত নদীভাঙনে পুরো চর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চললেও তা বন্ধে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।

সরেজমিনে যা দেখা গেছে

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মেঘনা নদীর বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে দিন-রাত শক্তিশালী একাধিক ড্রেজারের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে বালু উত্তোলন চলছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং নদীভাঙন দ্রুত আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন ও জাতীয় গ্রিডলাইনের পিলারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

নদী সুরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে পিলারের গোড়া থেকে বালু সরে গেলে যে কোনো সময় তা ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় গ্রিডের আওতাধীন ২৮টি জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিলীন হওয়ার শঙ্কায় চরসোনারপুর

অবৈধ ড্রেজিংয়ের ফলে চরসোনারপুর গ্রামের বসতবাড়ি ও আবাদি জমির খুব কাছ পর্যন্ত নদীভাঙন পৌঁছে গেছে। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা ভোজন চন্দ্র দাস বলেন, “প্রভাবশালীরা দিন-রাত ড্রেজার দিয়ে বালু তুলছে। প্রতিবাদ করলে হুমকি দেওয়া হয়। এভাবে চলতে থাকলে পুরো চর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে।”

আরেক বাসিন্দা রানা সরকার বলেন, “অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে আমাদের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। নদীভাঙনে চর আগেই অনেক ছোট হয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। আমরা দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ চাই।”

জাতীয় সম্পদ রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপের দাবি

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, অবিলম্বে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে নদীর পরিবেশ এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় শুধু চরসোনারপুর নয়, দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

নদী সুরক্ষা বিষয়ক সংগঠন ‘তরী বাংলাদেশ’-এর আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, “অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমরা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উত্থাপন করেছি। সেখানে জানানো হয়েছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশে কোনো ধরনের বালু উত্তোলনের লিজ দেওয়া হয়নি। কিশোরগঞ্জের ভৈরব অংশে লিজ থাকলেও একটি চক্র রাতের আঁধারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমানায় প্রবেশ করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। এতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো হুমকির মুখে পড়ছে। দ্রুত এই কার্যক্রম বন্ধ করা প্রয়োজন।”

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততা থাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা আইনগত অভিযান না থাকায় বালু উত্তোলনকারী সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, “কিশোরগঞ্জ অংশে ইজারা দেওয়া হলেও সেটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ অংশ থেকে প্রায় তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরে। কিন্তু একটি চক্র রাতের আঁধারে আমাদের সীমানায় প্রবেশ করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে।”

তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী দুই জেলার সমন্বয়ে খুব শিগগিরই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।