জাবির নামে ভুয়া পেজের ছড়াছড়ি, সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগ
- প্রকাশের সময় : ০৭:২২:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬
- / 9 বার পড়া হয়েছে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে পরিচালিত নানা ফেসবুক পেজ, গ্রুপ, বট আইডি ও ভুয়া অ্যাকাউন্ট ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে ক্যাম্পাসে। এসব প্ল্যাটফর্মে কখনো ক্যাম্পাসের খবর, ছবি ও শিক্ষার্থীদের নানা কার্যক্রম তুলে ধরা হলেও অভিযোগ রয়েছে— একই সঙ্গে যাচাইহীন তথ্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি, ট্রল, গুজব, রাজনৈতিক অপপ্রচার ও মানহানিকর কনটেন্টও ছড়ানো হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রশাসনের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাদের একটি অংশ বলছেন, পরিচয় গোপন রেখে পরিচালিত এসব প্ল্যাটফর্মের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানির ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার অভিযোগও সামনে এসেছে।
দুই বছরে ছয় প্ল্যাটফর্মে ১২ হাজার ৮৩৮ পোস্ট
বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জাবিসংশ্লিষ্ট ছয়টি ফেসবুক পেজ ও গ্রুপের কার্যক্রমের পরিসংখ্যান উঠে এসেছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ছয়টি প্ল্যাটফর্মে মোট ১২ হাজার ৮৩৮টি পোস্ট প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে JU Insiders-এ ২ হাজার ৮৬০টি, JU Sarcasm-এ ২ হাজার ৬৭৩টি, JU Update-এ ২ হাজার ৫৭৯টি, JU News-এ ২ হাজার ৯০টি, জাবির সকল সংবাদ-এ ১ হাজার ৭৬৮টি এবং Jahangirnagar Jokes-এ ৮৬৭টি পোস্ট প্রকাশিত হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, সময়ের ব্যবধানে এসব প্ল্যাটফর্মের সক্রিয়তায়ও পরিবর্তন এসেছে। JU Insiders ও JU Sarcasm-এর পোস্টের পরিমাণ যথাক্রমে ২৬ দশমিক ৫ ও ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ কমলেও JU Update-এর কার্যক্রম বেড়েছে ৯৪ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সময়ে JU News-এর পোস্ট বেড়েছে ২৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং Jahangirnagar Jokes-এর ১২১ দশমিক ৪ শতাংশ।
গবেষণায় সর্বোচ্চ সাপ্তাহিক পোস্টের সংখ্যা ছিল ৪৫৭টি। ২০২৫ সালের ৮ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর— এই এক সপ্তাহেই ওই সংখ্যক পোস্ট প্রকাশিত হয়।
তথ্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত আক্রমণের অভিযোগ
ক্যাম্পাসে JU Update, JU Dark Secrets, JU Insiders, Jahangirnagar University News, জাকসু মিম পোস্টিং, JU Sarcasm, JU Crushes & Confessions Official, Department of Politics: Republic of Jahangirnagar University, Jahangirnagar Jokes, জাবি কণ্ঠস্বর ও বটতলার খবরসহ বিভিন্ন পেজ ও প্ল্যাটফর্ম নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
এসব প্ল্যাটফর্মের সব কনটেন্টকে একই ধরনের বা নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। অনেক পেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতি, সাংস্কৃতিক আয়োজন, শিক্ষার্থীদের সাফল্য কিংবা ক্যাম্পাসজীবনের বিভিন্ন বিষয়ও প্রকাশিত হয়। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, এসব প্ল্যাটফর্মের একটি অংশ সময়ের সঙ্গে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আক্রমণ, রাজনৈতিক কনটেন্ট ও যাচাইহীন তথ্য প্রচারের দিকে ঝুঁকেছে।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়লে সেটি দ্রুত বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে পরে পোস্ট সরিয়ে ফেললেও ক্ষতির প্রভাব অনেক সময় থেকে যায়।
‘আমিও সাইবার বুলিংয়ের শিকার’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১ ব্যাচের শিক্ষার্থী মাধুবী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহারকারী পরিচয়হীন পেজ ও বট আইডির কারণে ক্যাম্পাসের অনলাইন পরিবেশ নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত বা ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হলে শিক্ষার্থীরা নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস বুঝতে পারবেন। একই সঙ্গে পরিচয়হীন প্ল্যাটফর্ম থেকে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অপমানজনক প্রচারণা বন্ধে প্রশাসনের দৃশ্যমান উদ্যোগ প্রয়োজন।
মাধুবীর অভিযোগ, এসব প্ল্যাটফর্মে নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্লাট-শেমিং, ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ ও বিভিন্ন ধরনের মানহানিকর পোস্ট করা হয়। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, তিনিও ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন।
জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মীমের মতে, ব্যক্তি ও রাজনৈতিক পক্ষকে কেন্দ্র করে উসকানিমূলক পোস্ট ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহারকারী পরিচয়হীন পেজ ও বট আইডির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বিভ্রান্তিকর ও হয়রানিমূলক কনটেন্টের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ছাত্রসংগঠনগুলোরও উদ্বেগ
বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারাও পরিচয়হীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহারকারী বিভিন্ন বট আইডি, ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও পরিচয়হীন পেজে ব্যক্তি আক্রমণের প্রবণতা বেড়েছে। নারী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়েও হয়রানিমূলক কনটেন্ট ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই অনানুষ্ঠানিক পেজগুলোর কার্যক্রম তাদের নজরে রয়েছে। ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে মানহানিকর প্রচারণা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ছাত্রশক্তি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি জিয়া উদ্দিন আয়ান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে পরিচালিত পরিচয়হীন প্ল্যাটফর্ম থেকে অপপ্রচার ও ব্যক্তিগত আক্রমণের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা উচিত। প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় দায়ীদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান তিনি।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (মার্ক্সবাদ) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংগঠক সজীব আহমেদ বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর নামে-বেনামে পরিচালিত বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে হয়রানিমূলক পোস্টের তৎপরতা বেড়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান তৈরি ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার অভিযোগও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি অদ্রি অংকুর বলেন, কয়েক বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহারকারী বিভিন্ন পেজ, গ্রুপ ও বট আইডি থেকে হয়রানি ও অপপ্রচারের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ প্রচারণা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করার প্রবণতা বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অ্যাডমিন ও মনিটরিং ব্যবস্থা থাকলে অপপ্রচার কমবে
গবেষক অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ মো. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের আড়াল ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে বাস্তব জীবনের মতো অনলাইনেও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে পরিচালিত পেজগুলোতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্ধারিত অ্যাডমিন রাখা এবং নিয়মিতভাবে সেগুলো পর্যবেক্ষণ করা হলে অপপ্রচার, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।
সাইবার বুলিং ঠেকাতে আসছে নতুন নীতিমালা
সাইবার বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, জাকসুর কার্যনির্বাহী বৈঠকে র্যাগিং ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগের বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। বর্তমান শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিধান এসব বিষয় মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়। এ কারণে প্রশাসন একটি কমিটি গঠন করেছে এবং কমিটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
তার ভাষ্য, নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে সাইবার বুলিং ও র্যাগিংয়ের সংজ্ঞা আরও স্পষ্ট হবে এবং অপরাধের ধরন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এমনকি বেনামি পেজ বা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কাউকে আক্রমণ করার ক্ষেত্রেও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কাঠামো তৈরি হতে পারে।
সমন্বিত উদ্যোগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা, মর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখতে এ ধরনের আইডি, পেজ ও গ্রুপের কার্যক্রমের বিষয়ে প্রক্টরিয়াল বডি, জাকসু ও প্রশাসন কাজ করছে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যান্টি-বুলিং সেল রয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে একটি কমিটিও কাজ করছে। কমিটির প্রস্তাবনা পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পরিচয়হীনতার আড়াল ভাঙার দাবি
বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহারকারী সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম যে অপপ্রচারের সঙ্গে যুক্ত এমন দাবি সংশ্লিষ্টদের কেউই করছেন না। বরং তাদের মূল উদ্বেগ, একটি অংশের পরিচয়হীনতা ও জবাবদিহির ঘাটতি।
শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে পরিচালিত প্ল্যাটফর্মগুলোকে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক এই দুই শ্রেণিতে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা দরকার। পাশাপাশি হয়রানিমূলক বা মানহানিকর কনটেন্টের অভিযোগ তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মনিটরিং চালু করা জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন ক্যাম্পাসজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখেই ব্যক্তিগত মর্যাদা, তথ্যের সত্যতা ও অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর কাঠামো তৈরি করাই এখন জাবির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



























