ঐক্যবদ্ধ না হলে বিপদ’—মুসলিম দেশগুলোকে মোজতবা খামেনির বার্তা
- প্রকাশের সময় : ০৮:০১:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
- / 5 বার পড়া হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘প্রকৃত শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। একই সঙ্গে ইরানের জনগণ ও কর্মকর্তাদের নিজেদের মধ্যকার বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পূর্তির সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
রোববার (৩১ আগস্ট) মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মদিন উপলক্ষে দেওয়া এক লিখিত বার্তায় তিনি বলেন, মুসলিম দেশগুলোর সমস্যার সমাধানের জন্য পারস্পরিক ঐক্য, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড শেষ পর্যন্ত ইসলামের শত্রুদের স্বার্থই পূরণ করে।
‘প্রকৃত শত্রুকে চিনুন’
মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের উদ্দেশে মোজতবা খামেনি বলেন, আপনাদের প্রকৃত শত্রুকে চিনুন, তাদের পরিকল্পনা বুঝুন এবং তাদের মোকাবেলা করুন।
এ বক্তব্যে তিনি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তার আহ্বান এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে সামরিক সংঘাত চলছে। এই সংঘাত ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশকেও প্রভাবিত করেছে।
যুদ্ধের সময় ইরান সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে ইরানের সঙ্গে এসব আরব দেশের সম্পর্কেও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
ইরানের জনগণকেও ঐক্যের বার্তা
মোজতবা খামেনি শুধু আঞ্চলিক দেশগুলোর উদ্দেশে নয়, নিজের দেশের জনগণ ও কর্মকর্তাদেরও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ইরানের জনগণের মধ্যে কোনো ধরনের বিভেদ তৈরি হতে দেওয়া উচিত নয়।
তার ভাষায়, সামাজিক ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা উচিত নয়।
শুক্রবার দেওয়া আরেকটি বার্তাতেও তিনি একই ধরনের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এর মাধ্যমে তিনি যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের সময় ইরানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভেদ কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
মোজতবা খামেনি কে?
মোজতবা খামেনি ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময় আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই মোজতবা খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ক্ষমতায় আসেন।
তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ইরানি কর্তৃপক্ষও এখন পর্যন্ত তার কোনো ভিডিও বা অডিও প্রকাশ করেনি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা দেশটির গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নীতির ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। ফলে মোজতবা খামেনির বক্তব্য ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং দেশটির পররাষ্ট্রনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থনীতিতেও পরিবর্তনের আহ্বান
যুদ্ধের পাশাপাশি ইরানের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটও মোজতবা খামেনির বক্তব্যে উঠে এসেছে।
শুক্রবারের বার্তায় তিনি ইরানের অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে ডি-ডলারাইজেশন বা মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে দেশের উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও জোর দেন তিনি।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ এবং মার্কিন নৌ অবরোধের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় দেশটির অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
মোজতবা খামেনির বক্তব্যে তাই একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ঐক্যের আহ্বান রয়েছে, অন্যদিকে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে এর অর্থ কী?
মোজতবা খামেনির এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের অবস্থান আরও জোরালো করার চেষ্টা করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে ইরানের সঙ্গে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডানসহ বেশ কয়েকটি দেশের সম্পর্ক বর্তমানে জটিল।
ইরান চাইছে, এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে নিজেদের আঞ্চলিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিক।
অন্যদিকে এসব আরব দেশও নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
ফলে মোজতবা খামেনির আহ্বানে মুসলিম দেশগুলো কতটা সাড়া দেবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
মোজতবা খামেনির বার্তার মূল কথা হলো, মুসলিম দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বিভেদ না করে একসঙ্গে থাকুক এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিক।
একই সঙ্গে তিনি ইরানের জনগণকে অভ্যন্তরীণ বিরোধ ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
যুদ্ধের কারণে ইরান যখন সামরিক ও অর্থনৈতিক— দুই ধরনের চাপের মুখে, তখন এই বক্তব্যকে দেশের ভেতরে ঐক্য ধরে রাখা এবং বাইরের দেশগুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।


























