সোলার সেচে বদলে যাচ্ছে নবীনগরের কৃষির চিত্র
- প্রকাশের সময় : ০৩:২৫:২১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
- / 2 বার পড়া হয়েছে
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার দীর্ঘদিনের অনাবাদি জমিতে এবার সৃষ্টি হয়েছে আউশ ধান চাষের নতুন সম্ভাবনা। নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক সোলার সেচ ব্যবস্থা এবং বারিড পাইপ নামক ভূ-গর্ভস্থ সেচ নালার ব্যবহার, কৃষি বিভাগের পরিকল্পিত উদ্যোগ এবং কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে চলতি মৌসুমে পৌরসভার দোলাবাড়ি, সাতমোড়া, রতনপুর ও সলিমগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় প্রথমবারের মতো প্রায় দেড়শ বিঘা জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে।
তিতাস নদীর তীরবর্তী এলাকায় ফ্রিপ (FREAP) প্রকল্পের অর্থায়নে স্থাপিত সোলার সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে নবায়নযোগ্য সৌরশক্তি ব্যবহার করে উন্নতমানের ভূগর্ভস্থ বারিড পাইপলাইনে কৃষিজমিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে সেচের পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষি বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্প ও প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের বিনামূল্যে উন্নতমানের বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ প্রদান করা হয়েছে। ফলে একসময় অনাবাদি পড়ে থাকা জমি এখন সবুজে ভরে উঠেছে।
সরেজমিনে দোলাবাড়ী গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, মাঠজুড়ে দুলছে সোনালি আউশ ধানের শীষ। সেখানে প্রথমবারের মতো প্রায় ৭৫ বিঘা জমিতে ব্রিধান-৯৮ ও ব্রিধান-৪৮ জাতের আউশ ধানের আবাদ হয়েছে।
পৌরসভার দোলাবাড়ী গ্রামের কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, “সরকারের সোলার সেচ স্কিমের কারণে এখন অল্প খরচে সেচ সুবিধা পাচ্ছি। কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় প্রথমবারের মতো এত বড় পরিসরে আউশ চাষ করেছি। ফসলের অবস্থা খুব ভালো, আশা করছি বাম্পার ফলন হবে।”
দোলাবাড়ির কৃষক বাবুল মিয়া জানান, “আমি প্রথমবারের মতো ব্রিধান ৯৮ আবাদ করেছি। আর সপ্তাহখানেক এর মধ্যে ধান কর্তন হবে, এখন পর্যন্ত মাঠের যা অবস্থা আমি অত্যন্ত আশাবাদী। এই বারিড পাইপের জন্য আমাদের সেচ নালা কাটার যে একটি কষ্ট সেটি শেষ হয়েছে, আগামীতে এই মাঠে আরো আউশ আবাদ বৃদ্ধি পাবে।”
সাতমোড়া ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সফুরুল্লাহ জানান, গত মৌসুমে কৃষক মন্নান মিয়ার ক্ষেতে বিনাধান-১৯-এর প্রদর্শনী সফল হওয়ায় তিনি বীজ সংরক্ষণ করেন। চলতি মৌসুমে বাংলাদেশ কৃষি পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রদর্শনী ও প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে। এর ফলে চুওরিয়া গ্রামে নতুন করে প্রায় ২৫ বিঘা জমিতে আউশ ধানের আবাদ সম্প্রসারিত হয়েছে।
চুওরিয়া গ্রামের কৃষক মন্নান মিয়া বলেন, “গত বছরের ভালো ফলনের কারণে সংরক্ষিত বীজ ব্যবহার করেছি। আমার কাছ থেকে আরও কয়েকজন কৃষক বীজ সংগ্রহ করে আউশ চাষ করেছেন। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত থাকায় এবার ফলনের সম্ভাবনাও অনেক ভালো।”
পৌরসভা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আক্তারুজ্জামান বলেন, “উপজেলা কৃষি অফিসারের সার্বিক নির্দেশনায় দোলাবাড়ী ব্লকে নতুন করে আউশ আবাদের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। উচ্চফলনশীল ব্রিধান-৯৮, ব্রিধান-৪৮ বীজ দিয়ে বীজতলা তৈরি করা হয়।কৃষকদের নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরামর্শ, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ দেওয়া হয়েছে। আধুনিক সোলার সেচ প্রযুক্তির কারণে আগামীতে আরও অনাবাদি জমি আউশ চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে।”
নবীনগর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, “নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার করে সোলার সেচ স্কিমের আওতায় প্রথমবারের মতো দোলাবাড়ীতে ৭৫ বিঘা জমি একসঙ্গে আউশ আবাদের আওতায় আনা হয়েছে। উন্নতমানের বারিড পাইপলাইনের মাধ্যমে সেচের পানি সরবরাহ করায় পানির অপচয় কমেছে এবং কৃষকদের সেচ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “চলতি মৌসুমে নবীনগর উপজেলায় প্রায় দেড়শ বিঘা অনাবাদি জমিতে নতুন করে আউশ আবাদ হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হলো বোরো মৌসুম শেষে বন্যামুক্ত অনাবাদি জমিগুলোকে স্বল্পমেয়াদি আউশ ধানের আওতায় এনে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।”
নবীনগরের এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রয়োগ এবং কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম একসঙ্গে মিললে অনাবাদি জমিও সোনালি ফসলে ভরে উঠতে পারে। মাঠজুড়ে দুলতে থাকা আউশ ধানের শীষ আজ শুধু একটি সফল মৌসুমের প্রতীক নয়, বরং টেকসই কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আগামীতে জ্বালানি সাশ্রয়ী এই প্রযুক্তি কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি পানির অপচয় হ্রাস করতে দারুণ ভূমিকা রাখবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।


























